প্রিয় আলিফ,
তোমার চিঠিটার উত্তর দিতে একটু দেরি হয়ে গেল, এ জন্য নীরব একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল। ভেবো না, ভুলে গিয়েছিলাম; বরং কিছু কিছু ব্যস্ততা আছে, যেগুলো মানুষকে নিজের সময়টুকুও ধার করে নিতে দেয় না।
তুমি তো জানোই, এখন গ্রামে ধান কাটার সময়। সকালগুলো কেমন যেন তাড়াহুড়ো করে ভোর হয়। উঠোনে ধান শুকাতে দেওয়া, গোলার জন্য বস্তা ঠিক করা, বাড়ির মানুষের খাবারের আয়োজন, কখনো মাঠে পানি পৌঁছে দেওয়া, কখনো কাটা ধানের পাশে দাঁড়িয়ে খেয়াল রাখা, দিনের ভেতর দিনটাকেই আলাদা করে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় মনে হয়, আজ তোমাকে উত্তর দেবো। তারপর রান্নাঘরের চুলার আগুন, উঠোনের কাজ, ছোটদের কোনো আবদার, সব মিলিয়ে রাতটা কেমন নিঃশব্দে ফুরিয়ে যায়। তবু মিথ্যে বলবো না, কাজের ফাঁকে ফাঁকে তোমার চিঠির কিছু লাইন অকারণেই মনে পড়েছে।
বিশেষ করে, যেখানে তুমি লিখেছিলে, ভালোবাসা বোধহয় কাউকে ধীরে ধীরে নিশ্চিন্ত করার নামও। কথাটা খুব সহজ, অথচ অদ্ভুতভাবে গভীর। কারণ মেয়েদের জীবনে নিশ্চিন্ত হওয়াটা খুব সহজ কিছু নয়। ছোটবেলা থেকে আমরা হিসেব করতে শিখি, কাকে কতটা বিশ্বাস করা যায়, কোথায় কতটা নিজের কথা বলা যায়, আর কোথায় একটু চুপ করে থাকতে হয়।
তাই যখন তুমি বলো, তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত চাইছো না, তখন স্বস্তি লাগে। মনে হয়, কেউ অন্তত ফুল ফোটার আগেই ডাল নেড়ে দেখতে চাইছে না। তুমি বলেছিলে, তুমি এমন একজন হতে চাও, যাকে ভেবে প্রতিদিন একটু একটু করে ভয় কমে।
জানো?
এই কথাটা পড়ে মনে হয়েছিল, মানুষ হয়তো
সত্যি সত্যিই শুধু ভালোবাসার জন্য প্রিয় হয় না; কখনো কখনো
নিরাপদ মনে হওয়ার কারণেও প্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে একটা কথা বলি? তোমার চিঠিগুলো মাঝে মাঝে আমাকে সাবধানও করে। কারণ খুব সুন্দরভাবে বলা কথাগুলো মানুষকে দুর্বলও করে দেয়। আর গ্রামের মেয়েদের দুর্বল হওয়ার সুযোগ কম। কেননা আমাদের অনেক কিছু ভাবতে হয়।
তবু আজ এটুকু স্বীকার করি, তোমার কথাগুলোকে এখন আর একেবারে দূরের কারও কথা মনে হয় না। হয়তো কারণ, তুমি স্বপ্নের চেয়ে বাস্তবের কথা বেশি বলো। অথবা হয়তো কারণ, তুমি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা কম করে বোঝার চেষ্টা বেশি করো।
আর তোমার সেই “পুনশ্চ” হেসেছিলাম পড়ে। তুমি জানতে চেয়েছিলে, কী নামে ডাকতে পারো আমাকে। সত্যি বলতে কী, এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে গিয়েই সবচেয়ে বেশি ভেবেছি।
কারণ কিছু নাম খুব আপন হয়ে যায়, আবার কিছু নাম অকারণে দূরত্ব রেখে দেয়। তবে আপাতত একটা ছোট অনুমতি রইলো, তুমি চাইলে আমাকে “শিউলি” বলে ডাকতে পারো।
কারণ শিউলি ফুল খুব বেশি সময় গাছে থাকে না, তবু ভোরবেলায় নীরবে মাটিতে পড়ে থেকেও কারও মন ভালো করে দিতে পারে। তবে এটাকে খুব বেশি বিশেষ কিছু ভেবে নিও না আবার। কারণ নাম দেওয়ার অধিকার যত সহজ, সেই নামের মানে ধরে রাখাটা তার চেয়ে কঠিন।
ইতি
তুমি চাইলে “শিউলি”