প্রিয় আলিফ,
তুমি জানো,
মানুষের লেখা পড়ে সাধারণত বোঝা যায় সে কী বলতে চায়। কিন্তু তোমার
চিঠি পড়ে বোঝা গেল, তুমি কী ভাবো। আর এই জায়গাটাই আমাকে
সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছে।
এখনকার সময়ে অনেকেই ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু খুব কম মানুষ আছে যারা ভালোবাসার পরের জীবনটাও কল্পনা করে। তুমি করেছো। তুমি শুধু একজন মেয়ের চোখ বা হাসি নিয়ে মুগ্ধ হওনি; তুমি তার ক্লান্তি নিয়ে ভেবেছো, তার নীরবতা নিয়ে ভেবেছো, এমনকি তার ভবিষ্যতের ভয়গুলো নিয়েও ভেবেছো। এই ভাবনাগুলোই তোমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
তুমি যখন লিখেছিলে,
“অভাব শব্দটা যেন অপমান হয়ে না লাগে”, তখন
জানো আমার কী মনে হয়েছিল? মনে হয়েছিল, মানুষ আসলে ব্যবহারে ধনী হয়, টাকায় না। কারণ
অনেক ঘর আছে যেখানে ভাত কম, কিন্তু শান্তি বেশি। আবার এমন
ঘরও আছে যেখানে সবকিছু আছে, শুধু মানুষগুলো একে অপরের
পাশে নেই।
তোমার কথাগুলো পড়ে প্রথমবার মনে হলো, তুমি হয়তো সংসারকে শুধু একসাথে থাকা ভাবো না; বরং একে অপরের ভাঙাচোরা দিনগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকার নামও সংসার মনে করো।
তুমি বলেছিলে,
ভালোবাসা শুধু উৎসবের দিনের জন্য বাঁচুক সেটা তুমি চাও না। এই
লাইনটা পড়ে আমি দীর্ঘসময় চুপ ছিলাম। কারণ সত্যি কথা বলতে কী, মেয়েরা প্রেমে পড়ার আগে শুধু ভালোবাসার ভাষা দেখে না, তারা ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও খোঁজে। তারা দেখতে চায়, মানুষটা রাগের দিনে কেমন হবে, অভাবের দিনে
কেমন হবে, ব্যর্থতার দিনে কেমন হবে। কারণ নদী শান্ত থাকলে
সবাই তার সৌন্দর্য দেখে, কিন্তু বর্ষায় তার ধৈর্যটাই আসল
পরিচয় দেয়।
তুমি হয়তো বুঝতে পারোনি,
তোমার চিঠির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, তুমি
বিশ্বাস জাগাতে জানো। আর বিশ্বাস এমন এক জিনিস, যা একবার
জন্মালে মানুষ আর সহজে নিরপেক্ষ থাকতে পারে না।
তবু আমি নিজেকে বারবার থামাই।
কারণ গ্রামের মেয়েদের জীবন কেবল নিজের অনুভূতি দিয়ে চলে না।
এখানে ভালোবাসার আগে পরিবার আসে, সমাজ আসে, মানুষের কথা আসে। আমাদের ইচ্ছেগুলো অনেক সময় পাখির মতো, আকাশ দেখতে পায়, কিন্তু উড়ার আগে চারপাশের
খাঁচাটাও বুঝে নিতে হয়।
তাই যদি কোনোদিন আমার উত্তর তোমার কাছে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়, সেটাকে অবহেলা ভেবো না। কিছু অনুভূতি খুব দ্রুত প্রকাশ করা যায় না; যেমন মাটির নিচে থাকা বীজও অঙ্কুর হওয়ার আগে অনেকদিন নীরবে ভিজে থাকে।
তবে আজ একটা কথা স্বীকার করি, তোমার চিঠিগুলো পড়ার পর থেকে আমি নিজেকেও নতুনভাবে ভাবতে শিখছি। আগে মনে হতো, ভালোবাসা মানেই হয়তো কাউকে খুব বেশি মনে পড়া। এখন বুঝছি, ভালোবাসা আসলে এমন একজন মানুষের উপস্থিতি, যার কথা ভাবলে ভবিষ্যৎকে আর পুরোপুরি ভয় লাগে না।
তুমি যখন ছোট ছোট বাস্তব কথাগুলো লিখো, তখন মনে হয়, তুমি ভালোবাসাকে ফুলের মতো দেখো না; তুমি তাকে বৃক্ষের মতো ভাবো। ধীরে বড় হয়, কিন্তু একসময় ছায়া দেয়।
আর অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো? তোমার চিঠি পড়ার পর থেকে আমি মাঝেমধ্যে ভবিষ্যতের খুব ছোট ছোট দৃশ্য কল্পনা করি। এই ছোট ছোট কল্পনাগুলোই আমাকে ভয় পাইয়ে দেয় কখনো। কারণ মানুষ যখন কাউকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না, তখনই সে সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে।
তুমি লিখেছিলে, মানুষ শেষ পর্যন্ত আশ্রয়ে বাঁচে। কথাটা সত্যি। তবে আশ্রয় হওয়াও খুব সহজ নয়। কারণ ঝড়ের দিনে গাছ যেমন শুধু নিজে দাঁড়িয়ে থাকে না, অন্যকেও আগলে রাখে, মানুষের ভালোবাসাও তেমন।
আর তোমার লেখা যত পড়ছি, তত মনে হচ্ছে, তুমি হয়তো সেই বিরল মানুষদের একজন, যারা ভালোবাসাকে অধিকার নয়, দায়িত্ব হিসেবেও বুঝতে পারে। তাই আজ আর নিজেকে পুরোপুরি আড়াল করে রাখতে পারলাম না। যদি কোনোদিন সত্যিই তোমার জীবনের সঙ্গে আমার দিনগুলো জড়িয়ে যায়, তবে আমি চাই, আমাদের সম্পর্কটা নদীর মতো হোক। উচ্ছ্বাস থাকবে, ভাঙনও থাকবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দু’জনের প্রবাহ যেন একই দিকে থাকে। আর যদি কখনো পথ কঠিনও হয়ে যায়, তাহলে অন্তত এটুকু যেন বলতে পারি, আমরা একে অপরকে কষ্ট দিয়েছি হয়তো, কিন্তু কখনো অসম্মান করিনি।
ইতি
সেই “কেউ একজন”
যে এখন তোমার চিঠির অপেক্ষা একটু বেশিই
করে।