প্রিয়,
তোমার শেষ চিঠিটার পর থেকে আমি মানুষকে নতুন করে লক্ষ্য
করতে শিখেছি।
আগেও গ্রাম দেখতাম, মাঠ দেখতাম, সন্ধ্যা দেখতাম, কিন্তু এখন মনে হয়, প্রতিটি জিনিসের ভেতরেই যেন তোমার কথার কোনো না কোনো প্রতিধ্বনি লুকিয়ে
আছে।
কাল বিকেলে খেয়াল করলাম, পাশের বাড়ির চাচী ভাঙা হাঁড়িটা খুব যত্ন করে ধুয়ে রোদে শুকোতে দিলেন। হঠাৎ মনে হলো, মানুষ আসলে যেটাকে ভালোবাসে, সেটাকে ফেলে দেয় না; যত পুরোনোই হোক, যত দাগই থাকুক, যত্ন করার কারণ খুঁজে নেয়। তখন তোমার কথা মনে পড়লো। ভালোবাসা বোধহয় এই রকমই, বড় বড় কবিতার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্বের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একধরনের নীরব মায়া।
তুমি বলেছিলে, সব মেঠোপথ ঘরে পৌঁছায় না। কথাটা সত্যি। কিন্তু কিছু পথ আছে, যেগুলো একবার কারও উঠোন চিনে ফেললে আর অন্য কোথাও যেতে চায় না। আমি হয়তো তেমনই এক পথ হয়ে গেছি, দিনশেষে তোমার কাছেই এসে থামতে ইচ্ছে করে।
তোমার চিঠির প্রতিটি লাইন আমি বহুবার পড়েছি।
মনে হয়েছে, তুমি কথা কম বলেও অনেক কিছু
বুঝিয়ে দিতে জানো। গ্রামের পুকুর যেমন উপরে স্থির থাকে, অথচ
তলার জলে অগণিত ঢেউ লুকিয়ে রাখে। তোমার ভেতরেও তেমন এক গভীরতা আছে, যেটা সহজে চোখে পড়ে না; কিন্তু একবার অনুভব
করলে আর ভুলে থাকা যায় না।
শোনো,
আমি তোমাকে মুগ্ধ করার মতো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। কারণ
আকাশের তারা ছুঁয়ে আনার গল্পে মানুষ কিছু সময় আনন্দ পায় ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস রাখে সেই মানুষের ওপর, যে বৃষ্টির রাতে চুপচাপ জানালাটা বন্ধ করে দেয়।
তুমি জানো,
আমি এখন আর শুধু তোমার হাসির কথা ভাবি না। ভাবি, তুমি কষ্ট পেলে কেমন চুপ হয়ে যাও। ভাবি, সারাদিনের
কাজের পর সন্ধ্যায় তোমার হাতদুটো নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ভাবি, গ্রামের মেয়েরা কত সহজভাবে সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়, অথচ কেউ তাদের ক্লান্তির ভাষা জানতে চায় না।
তুমি শুধু সুন্দর করে কথাই বলতে জানো না, তুমি অনুভবও করতে জানো।
তোমার চিঠিতে আমি প্রথমবার বুঝেছি, একজন
মানুষ একই সঙ্গে কোমল আর বুদ্ধিমান হতে পারে। তুমি আবেগকে প্রশ্রয় দাও, কিন্তু অন্ধ হও না। তুমি স্বপ্ন দেখো, আবার
মাটিতেও পা রাখো। এই ভারসাম্যটুকু খুব বিরল। হয়তো এই কারণেই তোমাকে অন্যরকম লাগে।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, মানুষ আসলে একা থাকার কষ্টে যতটা ভাঙে, তার চেয়েও বেশি ভাঙে ভুল মানুষের পাশে থেকে। তাই তোমাকে নিয়ে ভাবার সময় আমার ভেতরে শুধু আবেগ কাজ করে না, একধরনের সতর্ক মায়াও কাজ করে। আমি চাই না, কোনোদিন তোমার জীবনে এমন একজন হই, যার উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতি শান্তি দেয়।
আমি অনেক ভেবেছি, যদি কোনোদিন সত্যিই তোমার পাশে থাকার সুযোগ পাই, তাহলে ভালোবাসাটাকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবো? আমি চাই না আমাদের সম্পর্ক শুধু উৎসবের দিনের জন্য বেঁচে থাকুক। আমি চাই, ক্লান্ত দিনের মধ্যেও সেটা টিকে থাকুক।
আমি বরং ছোট ছোট কিছু কথা ভাবি,
একদিন হাটে গেলে তোমার পছন্দের লাল-নীল কাঁচের চুড়িগুলো দেখে দামাদামি করবো, যদিও দোকানদার বুঝে যাবে, আমি জিনিস না, মানুষের হাসি কিনতে এসেছি।
শীতের সকালে তুমি উঠোনে ধান মেলবে, আর আমি পাশে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে তোমার এলোমেলো চুলে আটকে থাকা খড়ের কণাগুলো দেখবো। হয়তো কিছু বলবো না, তবু সেই নীরবতাটুকুই আমাদের সবচেয়ে দীর্ঘ আলাপ হয়ে থাকবে।
কোনোদিন তোমার শরীর খারাপ হলে আমি ওষুধের নাম ভুলে যেতে পারি, কিন্তু সময়মতো পানি খেয়েছো কি না সেটা মনে রাখবো।
কোনোদিন বাজারে টাকা কম থাকলে হয়তো দু’জনেরই অনেক শখ অপূর্ণ থাকবে, তবু চেষ্টা করবো যেন তোমার মুখে “অভাব” শব্দটা অপমান হয়ে না লাগে।
তুমি যদি কোনোদিন খুব চুপচাপ হয়ে যাও, আমি জোর করে কারণ জানতে চাইবো না। কারণ সব দুঃখের ভাষা শব্দে হয় না; কিছু কষ্ট মানুষের চোখের নিচের ক্লান্তিতে লেখা থাকে।
আর যদি কখনো আমার ওপর রাগ করো, আমি চাইবো না তুমি ভয় পেয়ে নীরব হয়ে যাও। আমি চাইবো, তুমি তর্ক করো, অভিমান করো, নিজের কথাগুলো স্পষ্ট করে বলো। কারণ যে সম্পর্কে কথা বলার জায়গা মরে যায়, সেখানে ভালোবাসাও ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস হারায়। আমি শুধু সন্ধ্যায় তোমার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলবো, “চলো, একটু হাঁটি।” কারণ আমি জানি, কিছু অভিমান কথায় ভাঙে না, পাশাপাশি হাঁটলে ভেঙে যায়।
কোনো সম্পর্ক প্রতিদিন সমান সুন্দর থাকে না, এ কথাটা আমি বুঝি। কিছু দিন থাকবে, যেদিন হয়তো তুমি অকারণে চুপ হয়ে যাবে, আমিও ক্লান্ত হয়ে ফিরবো। তবু আমি চাই, সেই দিনগুলোতেও আমরা একে অপরকে প্রতিপক্ষ না ভেবে আশ্রয় ভাবতে পারি। কারণ সংসার শুধু ভালোবাসায়ই টিকে থাকে না; টিকে থাকে পরস্পরের ক্লান্তিকে সম্মান করার ক্ষমতায়।
তুমি হয়তো খেয়াল করোনি, তোমার চিঠির সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল, তুমি নিজেকে কখনো নিখুঁত দেখানোর চেষ্টা করোনি। তুমি ভয়গুলোকেও লুকাওনি। এই সততাটুকুই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে।
এখনকার সময়ে মানুষ খুব দ্রুত প্রিয় হতে চায়, কিন্তু খুব কম মানুষ আছে যারা সত্যি সত্যি বোঝার চেষ্টা করে। তোমার ভেতরে সেই ধৈর্য আছে। আর এই কারণেই তোমাকে ভাবলে আমার মনে তাড়না নয়, শান্তি জন্মায়।
তুমি জানো?
তোমার চিঠি পড়ে প্রথমবার মনে হয়েছিল, ভালোবাসা
হয়তো শুধু কাউকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছা নয়; বরং এমন একজন
মানুষকে খুঁজে পাওয়া, যার সঙ্গে নীরব থাকলেও মনে হয়
কথোপকথন চলছে।
মানুষ সাধারণত প্রেমে পড়ে সৌন্দর্যে, কিন্তু দীর্ঘসময় পাশে থাকতে ইচ্ছে করে চরিত্রের কাছে। তোমার ভেতরে আমি সেই বিরল জিনিসটাই দেখেছি, একটা শান্ত ব্যক্তিত্ব, যার পাশে বসলে মনে হয় মানুষ নিজের ভেতরের অস্থিরতাগুলো একটু নামিয়ে রাখতে পারে।
আর আমি?
আমি চেষ্টা করবো তোমার জন্য এমন একজন মানুষ হতে, যার কাছে
ফিরে এসে তুমি কোনোদিন নিজেকে একা মনে করবে না।
আমি জানি না তুমি আমার এই কথাগুলো পড়ে কী ভাববে। হয়তো আবার আগের মতোই অর্ধেক বুঝতে দেবে, অর্ধেক আড়াল করে রাখবে। তবু আজ এটুকু স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি তোমাকে শুধু ভালো লাগার জায়গা থেকে ভাবছি না। আমি তোমাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে ভাবছি, যার সঙ্গে একদিন জীবনের সাধারণ দিনগুলোও সুন্দর হতে পারে। যার সঙ্গে নীরব দুপুর পার করা যায়। অভাবের দিন পার করা যায়। বৃষ্টির রাতে টিনের চালে শব্দ শুনেও নিশ্চিন্ত থাকা যায়। এমনকি কোনো কথা না বলেও পাশাপাশি বসে থাকা যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ প্রেমে বাঁচে না শুধু, মানুষ বাঁচে আশ্রয়ে। আর অদ্ভুতভাবে, তোমাকে ভাবলেই আমার মনে হয়, আমি যেন সেই আশ্রয়ের দিকেই তাকিয়ে আছি। যার কাছে ভালোবাসা মানে শুধু হৃদয়ের বিষয় নয়, বরং জীবনেরও।
ইতি
তোমারই আলিফ