প্রিয় আলিফ,
তোমার চিঠিটা পড়ার পর অনেকক্ষণ উঠোনে বসে ছিলাম। সন্ধ্যার পর যেমন ধানের গন্ধে ভরে যায় চারপাশ, অথচ বোঝা যায় না বাতাসটা কোথা থেকে এলো, তোমার কথাগুলোও তেমন করেই এসে মনে লেগে রইলো।
তুমি আমাকে কী নামে ডাকবে, সে প্রশ্নের উত্তর আমারও জানা নেই। গ্রামের মেয়েদের নাম তো খুব ছোট হয়, কিন্তু তাদের নিয়ে মানুষের ধারণা বড় দীর্ঘ। তাই হঠাৎ কোনো নামে সাড়া দিতে ভয় লাগে; যেমন অচেনা ঘাটে নামার আগে মানুষ একবার জলের গভীরতা দেখে নেয়।
তুমি বলেছো, আমার হাসি নাকি শিউলির মতো। অথচ শিউলি তো ভোর হতেই ঝরে পড়ে। তাই প্রশংসা শুনলে কখনো কখনো ভয় হয়, সুন্দর জিনিসের আয়ু সাধারণত কমই হয় না তো?
তোমার লেখা পড়ে মনে হলো, তুমি মানুষকে খুব মন দিয়ে দেখো। এই সময়টায় এমন মানুষ কমে যাচ্ছে। এখন অধিকাংশ মানুষ নদীর দিকে তাকায় শুধু সেতু বানানোর জন্য, জলের শব্দ শোনার জন্য নয়। এই জায়গাটুকু তোমাকে আলাদা করেছে।
তবে একটা কথা বলি? মেঠোপথ খুব সুন্দর জিনিস, কিন্তু সব পথের শেষ ঘর পর্যন্ত পৌঁছায় না। কিছু পথ কেবল হাঁটার অনুভূতি দেয়, গন্তব্য দেয় না। তাই তোমার কথাগুলো পড়ে কখনো মনে হলো, আচ্ছা, মানুষটা হয়তো সত্যিই অপেক্ষা করতে জানে। আবার পরক্ষণেই মনে হলো, হয়তো এ শুধু বয়সের কোমল আবেগ, বর্ষার নদীর মতো; আজ গভীর, কাল শান্ত।
আমি খুব বেশি স্বপ্ন দেখতে শিখিনি। কারণ গ্রামে মেয়েদের স্বপ্ন কাঁথার নকশার মতো, দূর থেকে সুন্দর লাগে, কাছে এলে বোঝা যায় কত সুতো চাপা কান্নায় জোড়া লেগে আছে।
তবু সত্যি কথা বলতে কী, তোমার চিঠির কিছু লাইন আমার মন খারাপের ভেতর ছোট্ট প্রদীপের মতো জ্বলেছে। আবার কিছু লাইন পড়ার পর নিজেকেই বুঝিয়েছি, অতিরিক্ত আলোয় চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।
তুমি বলেছো, আমি একদিন শূন্য হলে যেন তোমার কথা ভাবি। মানুষ শূন্য হলেই কি শুধু কারও কথা ভাবে? কখনো কখনো মানুষ পূর্ণ থাকলেও নির্দিষ্ট একজনের কথাই মনে পড়ে, ঠিক যেমন ভরা আকাশেও হঠাৎ একটিমাত্র তারা চোখে আটকে যায়।
কিন্তু এই কথার মানে তুমি নিজের মতো করে ভেবো না। কারণ কাঁচা আমে যেমন টকও থাকে, মিষ্টির ইঙ্গিতও থাকে, আমার কথাগুলোও ঠিক তেমনই।
ভালো থেকো। আর হ্যাঁ, অপেক্ষা যদি করো, তবে নদীর মতো করো, শব্দ কম, গভীরতা বেশি।
ইতি......
কেউ একজন যে তোমার চিঠিটা একবার নয়, কয়েকবার পড়েছে।