পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তুমি যে চলে যাবে...
এ আমি জানতাম!
সেই ছোট্টকাল থেকেই তো দেখে আসছি,
শীত নামলেই ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখিরা আসে,
আকাশজুড়ে ডানা মেলে,
নদীর বুকে ভেসে বেড়ায়,
অন্যের জলাভূমিতে খুঁজে নেয় নিরাপদ আশ্রয়।
এ আমি জানতাম!
সেই ছোট্টকাল থেকেই তো দেখে আসছি,
শীত নামলেই ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখিরা আসে,
আকাশজুড়ে ডানা মেলে,
নদীর বুকে ভেসে বেড়ায়,
অন্যের জলাভূমিতে খুঁজে নেয় নিরাপদ আশ্রয়।
যে দেশের আকাশে তাদের ঠাঁই হয় না,
যে দেশের আবহাওয়া তাদের বাঁচতে দেয় না,
সেই দেশ ছেড়ে তারা উড়ে আসে,
অন্য কোনো দেশের নরম রোদে,
নিরাপদ জলাশয়ে...
নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার আশায়।
তারপর একদিন...
শীত ফুরোয়,
কুয়াশা সরে যায়,
রোদ ফিরে আসে,
প্রকৃতি আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
আর অতিথি পাখিরা?
তারা ঠিকই ডানা মেলে দেয়,
ফিরে যায় নিজেদের আকাশে,
নিজেদের দেশে,
নিজেদের চেনা ঠিকানায়।
পেছনে পড়ে থাকে শুধু
কিছু পালক,
কিছু পদচিহ্ন,
আর জলাশয়ের বুকে...
কিছুদিনের সহাবস্থানের স্মৃতি
আমি তখন থেকেই বুঝেছি,
আশ্রয় আর আপন ঠিকানা,
এক জিনিস নয়।
যে জলাশয় দুর্দিনে জীবন বাঁচায়,
সুদিনে তার কথা মনে রাখতেই হবে...
এমন কোনো নিয়ম প্রকৃতিতে নেই।
তবু মানুষ তো পাখি নয়!
মানুষের স্মৃতি আছে,
কৃতজ্ঞতা আছে...
আছে কারও পাশে থেকে যাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা।
তাই তোমাকে যখন আশ্রয় দিয়েছিলাম,
তখন তোমার ডানায় শেকল পরাইনি,
তোমার আকাশের সীমানা টেনে দিইনি,
তোমার ফেরার পথেও... কোনো পাথর ফেলে রাখিনি।
আমি শুধু ভেবেছিলাম,
পৃথিবীর সব অতিথি পাখি হয়তো এক নয়...
কেউ কেউ আশ্রয় পেলে,
সেই আশ্রয়দাতার জন্যও মনের কোথাও একটু জায়গা রাখে।
কিন্তু তুমি ?
তুমি আমাকে ভুল প্রমাণ করলে!
তোমার দুর্দিনে আমি ছিলাম নিরাপদ জলাশয়,
ঝড়ের রাতে নির্ভরতার ডাল,
বিপন্ন ডানার বিশ্রামস্থল।
ঝড়ের রাতে নির্ভরতার ডাল,
বিপন্ন ডানার বিশ্রামস্থল।
তোমার ক্লান্তি মুছে গেলে,
তোমার আকাশ পরিষ্কার হলে,
তোমার নিজের দেশে ফেরার সময় হলে...
তুমি আর একবারও ভাবলে না,
যে জল তোমার তৃষ্ণা মিটিয়েছে,
সেই জলাশয়েরও হয়তো তোমার জন্য কিছু মায়া জমেছিল!
তুমি চলে গেলে।
ঠিক যেমন চলে যায় শীতের অতিথি পাখিরা।
কোনো বিদায়সভা হয় না,
কোনো প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন পড়ে না,
কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে তারা তাদের প্রস্থানকে ভারী করে না।
শুধু এক সকালে ঘুম ভেঙে দেখি...
আকাশটা আগের মতোই আছে,
জলাশয়টাও আছে,
শুধু তোমার পরিচিত ডানার শব্দ নেই।
আর তখনই বুঝি,
কাউকে হারানো মানে সব সময় তার চলে যাওয়া নয়;
কখনো কখনো...
তার ফিরে আসার অপেক্ষায় নিজের ভেতর একটা ঋতু আটকে রাখা।
তবু শোনো...
আমি জলাশয় শুকিয়ে ফেলব না,
আকাশের দিকে তাকানো বন্ধ করব না,
শীত এলে অতিথি পাখিদের আসতেও নিষেধ করব না।
তুমি যদি আবার আসো,
আশ্রয় চাইলে যথাসাধ্য দেব,
ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিতে দেব।
কিন্তু এবার আর...
তোমার সাময়িক উপস্থিতিকে চিরস্থায়ী ভালোবাসা বলে ভুল করব না!
কারণ, আমি জেনে গেছি—
যে ফিরে আসে, সে-ই সবসময় আপন নয়;
যে আশ্রয় নেয়, সে-ই আশ্রয়দাতাকে ভালোবাসে না।
অতিথি পাখিরা প্রতিবছর ফিরে আসে,
তবু কোনো জলাশয়কে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা বলে ঘোষণা করে না।
তাদের আসা যেমন সত্য,
তাদের চলে যাওয়াও তেমন সত্য।
তোমার ক্ষেত্রেও তাই।
তুমি এসো...
যখন তোমার আকাশে ঝড় উঠবে,
যখন পরিচিত পৃথিবীটা তোমার কাছে অপরিচিত হয়ে যাবে,
যখন নিজের দেশেও নিজেকে পরবাসী মনে হবে।
তুমি এসো....
আমি তোমার জন্য দরজা বন্ধ করব না।
শুধু এবার মনে মনে কোনো স্থায়ী বসতির স্বপ্ন দেখব না।
আমি তোমার জন্য দরজা বন্ধ করব না।
শুধু এবার মনে মনে কোনো স্থায়ী বসতির স্বপ্ন দেখব না।
কারণ...
আশ্রয় দেওয়া আমার মানবিকতা,
আর নিজের হৃদয়কে রক্ষা করা আমার আত্মসম্মান।
তুমি তোমার ঋতু শেষে ফিরে যেয়ো,
আমি আমার জলাশয় নিয়ে বেঁচে থাকব।
আবার শীত আসবে,
আবার আকাশ ভরে যাবে অচেনা ডানার শব্দে।
হয়তো তাদেরই কোনো এক ঝাঁকে তোমাকেও দেখতে পাব।
চিনতে পারব কি না জানি না,
তবে এবার আর...
তোমার ফিরে আসাকে আমার জীবনে থেকে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ভাবব না।
কারণ, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তুমি যে চলে যাবে...
এ আমি জানতাম!
শুধু জানতাম না...
তোমাকে আশ্রয় দিতে দিতে একদিন আমাকেই শিখতে হবে...
কীভাবে শূন্য জলাশয় নিয়ে... বেঁচে থাকতে হয়।